সাংখ্য কারিকা

সাংখ্য কারিকা – বাংলা পাঠ, শব্দার্থ, অনুবাদ ও ভাষ্য

📜 Sticky Karikā is ON — each Karikā will stay on top while you scroll. This is to help study the śāstra in depth. You can turn it off anytime using the button below.

দুঃখত্রয়াভিঘাতাজ্জিজ্ঞাসা তদবঘাতকে হেতৌ ।
দৃষ্টে সাপার্থা চেন্নৈকান্তাত্যন্ততোঽভাবাৎ

॥ ১ ॥

শব্দার্থ

দুঃখ — কষ্ট, যন্ত্রণা, বেদনা, দুঃসহ অবস্থা, মানসিক ক্লেশ, অসন্তোষ
ত্রয় — তিন, তিনের সমষ্টি, ত্রিবিধ অবস্থা
আভিঘাতাৎ — আঘাত থেকে, পীড়ন থেকে, অত্যাচারের ফলে
জিজ্ঞাসা — অনুসন্ধান, অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানলাভের ইচ্ছা, প্রশ্ন করার প্রবৃত্তি, সত্য অন্বেষণ
তৎ — সেই, তা, ঐ বস্তু, পূর্বোক্ত বিষয়
আভিঘাতকে — আঘাতকারী, দমনকারী, বিনাশকারী
হেতৌ — কারণে, কারণের মধ্যে, উপায়ে, মূল তত্ত্বে, উৎপত্তিস্থলে, নিদানরূপে
দৃষ্টে — দৃষ্ট জগতে, প্রত্যক্ষ বিষয়ে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ক্ষেত্রে, অভিজ্ঞতাজনিত উপায়ে
সা — সেই (স্ত্রীলিঙ্গ), উক্ত, পূর্বোক্ত বিষয়, সেই জিজ্ঞাসা বা অনুসন্ধান
অপার্থা — অর্থহীন, নিষ্ফল, বৃথা, ফলশূন্য, অপ্রয়োজনীয়, ব্যর্থ
চেত্ — যদি, তবে যদি, যদি এমন হয়, শর্তস্বরূপে
— না, নয়, কখনোই নয়, অস্বীকার, নিষেধ
একান্ত — নিশ্চিত, অব্যর্থ, ব্যতিক্রমহীন, সর্বদা কার্যকর, সন্দেহাতীত
অত্যন্ততঃ — চূড়ান্তভাবে, সম্পূর্ণভাবে, স্থায়ীভাবে, পুনরাবৃত্তিহীনভাবে
অভাবাৎ — অভাবের কারণে, অনুপস্থিতির জন্য, না থাকার ফলে

অনুবাদ

ত্রিবিধ দুঃখের আঘাতে মানুষ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়—সে অনুসন্ধান সেই হেতুর বিষয়ে, যা এই দুঃখত্রয়কে বিনাশ করতে পারে।
যদি বলা হয় যে প্রত্যক্ষ উপায় বিদ্যমান থাকায় এই অনুসন্ধান অর্থহীন, তবে তা ঠিক নয়; কারণ সেই উপায়গুলি না নিশ্চিতভাবে (একান্তভাবে) দুঃখ নাশ করতে পারে, না চূড়ান্তভাবে (অত্যন্ততঃ) দুঃখের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে পারে।

গৌড়পাদ ভাষ্য

কপিলায় নমস্তস্মৈ যেনাচিদ্যোদধৌ জগতি মগ্নে
কারুণ্যাৎ সাংখ্যময়ো নৌরিব বিহিতা প্রতরণায় ।
অল্পগ্রন্থং স্পষ্টং প্রমাণসিদ্ধান্তহেতুভির্যুক্তং
শাস্ত্রং শিষ্যহিতায় সমাসতো’হং প্রবক্ষ্যামি ॥

শব্দার্থ

কপিলায় = কপিলকে, নমঃ = প্রণাম, তস্মৈ = তাঁকে, যেন = যাঁর দ্বারা, অচিত্-উদধৌ = অজ্ঞানরূপ সমুদ্রে, জগতি = এই জগতে, মগ্নে = নিমজ্জিত অবস্থায়, কারুণ্যাৎ = করুণাবশত, সাংখ্য-ময়ঃ = সাংখ্যদর্শনরূপ, নৌঃ-ইব = নৌকার মতো, বিহিতা = নির্মিত হয়েছে, প্রতরণায় = পার করে দেওয়ার জন্য, অল্প-গ্রন্থং = অল্প আকারের গ্রন্থ, স্পষ্টং = স্পষ্ট, প্রমাণ-সিদ্ধান্ত-হেতুভিঃ-যুক্তং = প্রমাণ, সিদ্ধান্ত ও যুক্তি দ্বারা সংযুক্ত, শাস্ত্রং = শাস্ত্র, শিষ্য-হিতায় = শিষ্যদের কল্যাণের জন্য, সমাসতঃ = সংক্ষেপে, অহং = আমি, প্রবক্ষ্যামি = ব্যাখ্যা করব

করুণাবশত যিনি সাংখ্য দর্শন প্রদান করেছিলেন সেই কপিলকে প্রণাম—যেন তিনি এই দর্শনকে একটি নৌকার মতো করে দিয়েছেন, যার দ্বারা অজ্ঞতার সমুদ্রে নিমজ্জিত এই জগৎ পার হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণার্থে, এই সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট গ্রন্থে প্রদত্ত এই তত্ত্বকে আমি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করব—যে তত্ত্ব শাস্ত্রপ্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।


দুঃখত্রয়েতি । অস্যা আর্যায়া উপোদ্ঘাতঃ ক্রিয়তে ॥ ইহ ভগবান্ ব্রহ্মসুতঃ কপিলো নাম, তদ্যথা – সনকশ্চ সনন্দশ্চ তৃতীয়শ্চ সনাতনঃ আসুরিঃ কপিলশ্চৈব বোধুঃ পঞ্চশিখস্তথা । ইত্যেতে ব্রহ্মণঃ পুত্রাঃ সপ্ত প্রোক্তাঃ মহর্ষয়ঃ ॥

শব্দার্থ

দুঃখত্রয়ে ইতি = ‘দুঃখত্রয়’ এই শব্দ দ্বারা, অস্যা = এই (আর্যার), আর্যায়াঃ = আর্যা ছন্দের শ্লোকের, উপোদ্ঘাতঃ = ভূমিকা, সূচনা, ক্রিয়তে = করা হয়, ইহ = এখানে, ভগবান্ = ভগবান, পূজনীয়, ব্রহ্মসুতঃ = ব্রহ্মার পুত্র, কপিলঃ = কপিল, নাম = নামে, তদ্যথা = যেমন, এইরূপ, সনকঃ = সনক, = এবং, সনন্দঃ = সনন্দন, = এবং, তৃতীয়ঃ = তৃতীয়, = এবং, সনাতনঃ = সনাতন, আসুরিঃ = আসুরি, কপিলঃ = কপিল, = এবং, এব =ই, নিশ্চয়ই, বোধুঃ = বোধু, পঞ্চশিখঃ = পঞ্চশিখা, তথা = তদ্রূপ, তেমনি, ইতি = এইরূপে, এতে = এঁরা, ব্রহ্মণঃ = ব্রহ্মার, পুত্রাঃ = পুত্রগণ, সপ্ত = সাত, প্রোক্তাঃ = উক্ত, বলা হয়েছে, মহর্ষয়ঃ = মহর্ষিগণ

এখন ত্রিবিধ দুঃখ প্রভৃতি বিষয়ক এই আর্যা শ্লোকটি প্রবর্তিত হচ্ছে।
দিব্য ঋষি কপিল ছিলেন ব্রহ্মার পুত্র। যেমন বলা হয়েছে—
‘সনক, সনন্দন, সনাতন (তৃতীয়), আসুরি, কপিল, বোধু এবং পঞ্চশিখা—এই সাতজন মহর্ষিকে ব্রহ্মার পুত্র বলা হয়।



কপিলস্য সহোৎপন্না ধর্মো জ্ঞানং বৈরাগ্যমৈশ্বর্যৈশ্চেতি। এবং স উৎপন্নঃ সন্নন্ধত্তমসি মজ্জজ্জগদালোক্য সংসারপারম্পর্যৈণ সৎকারুণ্যো জিজ্ঞাসমানায় আসুরিগোত্রায় ব্রাহ্মণায় ইদং পঞ্চবিংশতিতত্ত্বানাং জ্ঞানম্ উক্তবান্, যস্য জ্ঞানাদ্ দুঃখক্ষয়ো ভবতি–

শব্দার্থ

কপিলস্য = কপিলের, সহোৎপন্না = সঙ্গে জন্মগ্রহণকারী, ধর্মঃ = ধর্ম, জ্ঞানং = জ্ঞান, বৈরাগ্যম্ = বৈরাগ্য, ঐশ্বর্যৈঃ = ঐশ্বর্য দ্বারা/ঐশ্বর্যসমূহ, = এবং, ইতি = এইরূপ, এবং = এইভাবে, সঃ = তিনি, উৎপন্নঃ = জন্মগ্রহণকারী, সন্নন্ধৎ-তমসি = ঘন অন্ধকারে, মজ্জৎ-জগৎ-আলোক্য = নিমজ্জিত জগতকে দেখে, সংসার-পারম্পর্যৈণ = সংসারের ধারাবাহিকতার কারণে, সৎ-কারুণ্যঃ = গভীর করুণায় পরিপূর্ণ, জিজ্ঞাসমানায় = জিজ্ঞাসু অবস্থায়, আসুরি-গোত্রায় = আসুরি গোত্রের, ব্রাহ্মণায় = ব্রাহ্মণকে, ইদং = এই, পঞ্চবিংশতি-তত্ত্বানাং = পঁচিশ তত্ত্বের, জ্ঞানম্ = জ্ঞান, উক্তবান্ = উপদেশ দিয়েছিলেন/বলেছিলেন, যস্য = যার, জ্ঞানাৎ = জ্ঞান থেকে, দুঃখ-ক্ষয়ঃ = দুঃখের ক্ষয়, ভবতি = হয়

কপিল জন্ম থেকেই যেসব গুণে ভূষিত ছিলেন, তা হলো—ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য। এইভাবে তিনি (কপিল), এই সব গুণসহ জন্মগ্রহণ করে, অন্ধকারতম অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত এই সংসারজগতকে প্রত্যক্ষ করে, সংসারপরম্পরার কারণে গভীর করুণায় পূর্ণ হয়ে, জিজ্ঞাসু অবস্থায়, আসুরিগোত্রের ব্রাহ্মণকে এই পঁচিশ তত্ত্বের জ্ঞান উপদেশ করেছিলেন; যে জ্ঞানের দ্বারা দুঃখের ক্ষয় (নাশ) ঘটে।


পঞ্চবিংশতিতত্ত্বজ্ঞো যত্র তত্রাশ্রমে বসেত্ ।
জটী মুণ্ডী শিখী বাপি মুচ্যতে নাত্র সংশয়ঃ ।
তদিদমাহ– দুঃখত্রয়াভিঘাতাজ্জিজ্ঞাসেতি ।
তত্র দুঃখত্রয়ম্ আধ্যাত্মিকম্ আধিভৌতিকম্
আধিদৈবিকং চেতি । তত্রাধ্যাত্মিকং দ্বিবিধং–শারীরং
মানসং চেতি । শারীরং বাতপিত্তশ্লেষ্মবিপর্যয়কৃতং
জ্বরাতিসারাদি । মানসং প্রিয়বিয়োগাপ্রিয়সংযোগাদি । আধিভৌতিকং চতুর্বিধভূতগ্রামনিমিত্তং মনুষ্যপশুমৃগপক্ষিসরীসৃপদংশমশকযূকামত্কুণমৎস্যমকরগ্রাহস্থাবরেভ্যঃ জরায়ুজাণ্ডজস্বেদজোদ্ভিজ্জেভ্যঃ সকাশাৎ উপজায়তে ।
আধিদৈবিকং– দেবানামিদং দৈবম্, দিবঃ প্রভবতীতি
বা দৈবম্, তদধিকৃত্য যদুপজায়তে শীতোষ্ণবাতবৃষ্ট্যশনিপাতাদিকম্ ॥

শব্দার্থ

পঞ্চবিংশতিতত্ত্বজ্ঞঃ = পঁচিশ তত্ত্বের জ্ঞানী, যত্র = যেখানে, তত্র = সেখানে, আশ্রমে = আশ্রমে, বসেত্ = বাস করুক, জটী = জটাধারী, মুণ্ডী = মুণ্ডিত, শিখী = শিখাধারী, বা = অথবা, অপি = এমনকি, মুচ্যতে = মুক্ত হয়, = না, অত্র = এখানে, সংশয়ঃ = সংশয়, তৎ = সেই, ইদম্ = এই, আহ = বলেছেন, দুঃখত্রয়াভিঘাতাৎ = দুঃখত্রয়ের অভিঘাত থেকে, জিজ্ঞাসা = অনুসন্ধান, ইতি = এইরূপ, তত্র = সেখানে, দুঃখত্রয়ম্ = দুঃখের ত্রয়, আধ্যাত্মিকম্ = অধ্যাত্মিক, আধিভৌতিকম্ = আধিভৌতিক, আধিদৈবিকম্ = আধিদৈবিক, = এবং, ইতি = এইরূপ, তত্র = সেখানে, আধ্যাত্মিকম্ = অধ্যাত্মিক দুঃখ, দ্বিবিধম্ = দুই প্রকার, শারীরম্ = শারীরিক, মানসম্ = মানসিক, = এবং, ইতি = এইরূপ, শারীরম্ = শারীরিক দুঃখ, বাতপিত্তশ্লেষ্মবিপর্যয়কৃতম্ = বাত-পিত্ত-কফের বৈষম্যজনিত, জ্বরাতিসারাদি = জ্বর, অতিসার ইত্যাদি, মানসম্ = মানসিক দুঃখ, প্রিয়বিয়োগ = প্রিয়ের বিচ্ছেদ, অপ্রিয়সংযোগাদি = অপ্রিয়ের সংযোগ ইত্যাদি, আধিভৌতিকম্ = আধিভৌতিক দুঃখ, চতুর্বিধভূতগ্রামনিমিত্তম্ = চার প্রকার জীবসমষ্টিজনিত, মনুষ্য = মানুষ, পশু = পশু, মৃগ = বন্যপ্রাণী, পক্ষি = পাখি, সরীসৃপ = সরীসৃপ, দংশ = দংশকারী কীট, মশক = মশা, যূকা = উকুন, মত্কুণ = ছারপোকা, মৎস্য = মাছ, মকর = মকর, গ্রাহ = কুমির, স্থাবরেভ্যঃ = স্থাবর বস্তুসমূহ থেকে, জরায়ুজ = জরায়ুজ, অণ্ডজ = অণ্ডজ, স্বেদজ = স্বেদজ, উদ্ভিজ্জেভ্যঃ = উদ্ভিজ্জ থেকে, সকাশাৎ = নিকট থেকে, উপজায়তে = উৎপন্ন হয়, আধিদৈবিকম্ = আধিদৈবিক দুঃখ, দেবানাম্ = দেবতাদের, ইদম্ = এই, দৈবম্ = দৈব, দিবঃ = আকাশ/দিবলোক থেকে, প্রভবতি = উৎপন্ন হয়, ইতি = এইরূপ, বা = অথবা, দৈবম্ = দৈব, তদধিকৃত্য = তাদের অধীন হয়ে, যৎ = যা, উপজায়তে = উৎপন্ন হয়, শীত = শীত, উষ্ণ = উষ্ণতা, বাত = বায়ু, বৃষ্টি = বৃষ্টি, অশনিপাত = বজ্রপাত, আদিকম্ = ইত্যাদি

পঁচিশ তত্ত্বের জ্ঞানী ব্যক্তি যে কোনো আশ্রমেই বাস করুক না কেন—সে জটাধারী হোক, মুণ্ডিত হোক বা শিখাধারী হোক—নিশ্চয়ই মুক্ত হয়, এতে কোনো সংশয় নেই।
এই কথাই বলা হয়েছে—‘দুঃখত্রয়ের অভিঘাত থেকে জিজ্ঞাসা উৎপন্ন হয়।
এখানে দুঃখত্রয় হলো—আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক।
এর মধ্যে আধ্যাত্মিক দুঃখ দুই প্রকার—শারীরিক ও মানসিক।
শারীরিক দুঃখ বাত, পিত্ত ও শ্লেষ্মার বৈপরীত্যজনিত; যেমন জ্বর, অতিসার (আমাশয়) প্রভৃতি।
মানসিক দুঃখ হলো প্রিয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং অপ্রিয়ের সঙ্গে সংযোগ ইত্যাদি।
আধিভৌতিক দুঃখ চতুর্বিধ ভূতসমষ্টি থেকে উৎপন্ন—অর্থাৎ মানুষ, পশু, হরিণ, পাখি, সরীসৃপ, দংশকারী কীট, মশা, উকুন, ছারপোকা, মাছ, মকর, কুমির ও স্থাবর বস্তুসমূহ থেকে।
এগুলো জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ ও উদ্ভিজ্জ এই চার প্রকার যোনি থেকে উৎপন্ন জীবদের দ্বারা সংঘটিত হয়।
আধিদৈবিক দুঃখ—যা দেবতাদের অধীন, বা যা দিব (আকাশ/দেবলোক) থেকে উৎপন্ন বলে ‘দৈব’ বলা হয়। তাদের অধিকারভুক্ত যা কিছু ঘটে, যেমন শীত, উষ্ণতা, বায়ু, বৃষ্টি, বজ্রপাত প্রভৃতি—সেগুলো থেকেই যে দুঃখ উৎপন্ন হয়, সেটাই আধিদৈবিক দুঃখ।



এবং যথা দুঃখত্রযাভিঘাতাজ্জিজ্ঞাসা কার্যা । ক্ব? তদভিঘাতকে হেতৌ । তস্য দুঃখত্রযস্য অভিঘাতকো যোঽসৌ হেতুস্তত্রেতি । ‘দুষ্টেসাপার্থা চেত্‌’ দুষ্টে হেতো দুঃখত্রযাভিঘাতকে সা জিজ্ঞাসাঽপার্থা চেদ্‌ যদি, তত্রাধ্যাত্মিকস্য দ্বিবিধস্যাপি আযুর্বেদশাস্ত্রক্রিযযা প্রিযসমাগমাপ্রিযপরিহারকট্তিক্তকষাযক্বাথাদিভিদুপ্ট এব আধ্যাত্মিকোপায: , আধিভৌতিকস্য রসাদিনাঽভিধাতো দুষ্টঃ, দুষ্টে সাঽপার্থা চেদেবং মন্যসে; ন, ঐকান্তাত্যন্ততোঽভাবাত্‌ । যত একান্ততোঽবশ্যংত্যন্ততো নিত্যং দুষ্টেন হেতুনাঽভিঘাতো ন ভবতি তস্মাদন্যত্র একান্তাত্যন্তাভিঘাতকে হেতৌ জিজ্ঞাসাং বিবিদিষা কার্যেতি ॥

শব্দার্থ

এবং = এইভাবে, যথা = যেমন, দুঃখত্রয়াভিঘাতাৎ = দুঃখত্রয়ের অভিঘাত থেকে, জিজ্ঞাসা = অনুসন্ধান, কার্য্যা = করা উচিত, ক্ব = কোথায়, তৎ-অভিঘাতকে = তার অভিঘাতকারী, হেতৌ = হেতুর বিষয়ে, তস্য = তার, দুঃখত্রয়স্য = দুঃখত্রয়ের, অভিঘাতকঃ = আঘাতকারী, যঃ = যে, অসৌ = এই, সেই, হেতুঃ = কারণ, তত্র = সেখানে, ইতি = এইরূপে, দৃষ্টে = প্রত্যক্ষে, সা = সেই, অপার্থা = অর্থহীন, চেত্ = যদি, হেতৌ = হেতু বিদ্যমান থাকলে, দুঃখত্রয়াভিঘাতকে = দুঃখত্রয়ের অভিঘাতকারী (উপায়ে), জিজ্ঞাসা = অনুসন্ধান, অপার্থা = নিষ্ফল, যদি = যদি, তত্র = সেখানে, আধ্যাত্মিকস্য = অধ্যাত্মিকের, দ্বিবিধস্য = দ্বিবিধের, অপি = এমনকি, আয়ুর্বেদশাস্ত্রক্রিয়য়া = আয়ুর্বেদশাস্ত্রের চিকিৎসার দ্বারা, প্রিয়সমাগম = প্রিয়ের সঙ্গে মিলন, অপ্রিয়পরিহার = অপ্রিয়ের পরিত্যাগ, কটু = কটু, তিক্ত = তিক্ত, কষায় = কষায় স্বাদ, ক্বাথাদিভিঃ = ক্বাথ প্রভৃতির দ্বারা, দৃষ্টঃ = প্রত্যক্ষভাবে বিদ্যমান, এব =ই, আধ্যাত্মিকোপায়ঃ = অধ্যাত্মিক দুঃখনাশের উপায়, আধিভৌতিকস্য = আধিভৌতিকের, রক্ষাদিনা = রক্ষা প্রভৃতির দ্বারা, অভিঘাতঃ = নিবারণ, দৃষ্টঃ = প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়, মন्यসে = তুমি মনে করো, = না, একান্তাত্যন্ততো’ভাবাৎ = একান্ত ও অত্যন্ততার অভাবের জন্য, যৎ = কারণ যে, একান্ততঃ = নিশ্চিতভাবে, অত্যন্ততঃ = চূড়ান্তভাবে, নিত্যং = সর্বদা, দৃষ্টেন = প্রত্যক্ষ উপায় দ্বারা, হেতুনা = হেতুর দ্বারা, অভিঘাতঃ = দুঃখনাশ, = না, ভবতি = হয়, তস্মাৎ = অতএব, অন্যত্র = অন্যত্র, একান্তাত্যন্তাভিঘাতকে = একান্ত ও অত্যন্তভাবে অভিঘাতকারী, হেতৌ = হেতুর বিষয়ে, জিজ্ঞাসাং = অনুসন্ধানকে, বিবিদিষা = জানার আকাঙ্ক্ষায়, কার্য্যা = করা উচিত, ইতি = এইরূপ।

এইভাবে, যেমন বলা হয়েছে, দুঃখত্রয়ের অভিঘাত থেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত। কিসের জিজ্ঞাসা?
এই ত্রিবিধ দুঃখের অপসারণের উপায়ের জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ যে হেতু এই দুঃখত্রয়কে আঘাত করে বিনাশ করতে পারে, এই জিজ্ঞাসা করা উচিত।
যদি বলা হয়— ‘দৃষ্টে সা অর্থহীনা চেত্’, অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ হেতুতে এই জিজ্ঞাসা অর্থহীন—যদি এমন মনে করো, তবে শোনো।
অধ্যাত্মিক দুঃখের ক্ষেত্রে, যেহেতু তা দ্বিবিধ, তাই তার প্রতিকার হিসেবে আয়ুর্বেদশাস্ত্রসম্মত চিকিৎসা, প্রিয়ের সঙ্গে মিলন, অপ্রিয়ের পরিহার, তিক্ত, কটু ও কষায় রসযুক্ত ক্বাথ প্রভৃতির দ্বারা প্রত্যক্ষ উপায় বিদ্যমান আছে।
আধিভৌতিক দুঃখের ক্ষেত্রেও অস্ত্র, রক্ষা-প্রতিরক্ষা প্রভৃতির দ্বারা তার অভিঘাতকারী উপায় প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়।
এইসব প্রত্যক্ষ উপায় বিদ্যমান বলে যদি তুমি মনে করো যে জিজ্ঞাসা অর্থহীন, তবে তা ঠিক নয়।
কেন? কারণ একান্ত ও অত্যন্তভাবে তার অভাব রয়েছে। অর্থাৎ এই প্রত্যক্ষ হেতুগুলি দ্বারা দুঃখের অভিঘাত একান্তভাবে (নিশ্চিতভাবে) এবং অত্যন্তভাবে (চূড়ান্ত ও স্থায়ীভাবে) হয় না। তারা সব সময় এবং চিরকালের জন্য দুঃখকে বিনাশ করতে পারে না।
অতএব এইসব প্রত্যক্ষ উপায়ের বাইরে অন্যত্র, এমন এক হেতুর বিষয়ে জিজ্ঞাসা ও গভীর অনুসন্ধান করা উচিত, যা একান্ত ও অত্যন্তভাবে দুঃখত্রয়ের অভিঘাত করতে সক্ষম।


যুক্তিদীপিকা

প্রতিপক্ষ: কী ধরনের গুণসম্পন্ন শিষ্যের কাছে এই দার্শনিক গ্রন্থটি ব্যাখ্যা করা উচিত?

পক্ষসমর্থক: এই দার্শনিক গ্রন্থটি সেই শিষ্যের কাছেই ব্যাখ্যা করা উচিত, যে
জ্ঞানলাভে আগ্রহী,
বুদ্ধিমান,
অনুসন্ধিৎসু বা সত্যের অনুসন্ধানকারী,
জ্ঞানার্থে প্রয়োজনে থাকা (অভাববোধসম্পন্ন),
এবং গুরুর শরণাপন্ন হয়েছে।

প্রতিপক্ষ: কেন? (এর প্রমাণ কী?)

পক্ষসমর্থক: সর্বোচ্চ দ্রষ্টার প্রামাণ্যতার ভিত্তিতে। কারণ জগতে প্রথম জন্মগ্রহণকারী ভগবান কপিল, আসুরির জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা এবং ধারাবাহিক বিশেষ গুণসমূহ অর্জনের যোগ্যতা উপলব্ধি করে তাঁকেই এই দর্শনব্যবস্থা উপদেশ দিয়েছিলেন।

উদ্দীপক ও গতিশীল গুণ, অর্থাৎ রাজস গুণই আসলে দুঃখস্বরূপ। এই দুঃখের নিবৃত্তি কামনাকারী ব্যক্তির জন্যই বিচারবোধজাত জ্ঞান নির্দিষ্ট করা হয়েছে, কারণ সেই জ্ঞান স্বভাবতই হালকা ও দীপ্ত গুণ, অর্থাৎ সত্ত্বগুণের প্রকৃতির। এই অর্থই “এর দ্বারা সত্ত্ব প্রকাশিত হয়” ইত্যাদি উক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যাত হয়েছে এবং মহাপুরুষদের দ্বারাও তা প্রতিপাদিত হয়েছে। অতএব এই শাস্ত্র সেই ব্যক্তির ত্রিবিধ দুঃখনিবারণের জন্য প্রবৃত্ত, যে দুঃখের উদ্দীপক ও চঞ্চল কারণরূপ রাজসগুণের আক্রমণ প্রশমিত করতে ইচ্ছুক এবং যে ফলপ্রদ গুণসমূহ থেকে উৎপন্ন কল্যাণ ও সদ্গুণসমূহকে, যা সত্ত্বগুণের দীপ্ত ও হালকা স্বভাবজনিত এবং জাগতিক কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত, সেগুলিকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি ও বিকশিত করতে চায়। এই শাস্ত্রের অর্থ যথাযথভাবে উপলব্ধি করলে শিষ্যের দুঃখ ও গুণসমূহের সঞ্চিত ভাণ্ডার পরিপক্বতায় পৌঁছে পরিসমাপ্ত হয়। শিষ্য কীভাবে মোক্ষলাভ করতে পারে—এই উদ্দেশ্যেই এই ব্যাখ্যার আরম্ভ।

প্রতিপক্ষ: আপনি যে বলছেন, এই শাস্ত্রটি জ্ঞানলাভে ইচ্ছুক শিষ্যের নিকট ব্যাখ্যা করা উচিত, সে বিষয়ে আমরা জিজ্ঞাসা করি— কেন এই জ্ঞানলাভের ইচ্ছা জন্মায় এবং কোন বিষয়কে লক্ষ্য করে এই জিজ্ঞাসা বা জানবার আকাঙ্ক্ষা উদ্ভূত হয়?

পক্ষসমর্থক: আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে— কেন জ্ঞানলাভের এই আকাঙ্ক্ষা জন্মায়— আমরা বলি:

ত্রিবিধ দুঃখের আক্রমণের কারণেই জ্ঞানলাভের ইচ্ছা উদ্ভূত হয়।

দুঃখ এবং রাজস একার্থক। যা পীড়া সৃষ্টি করে, সেটাই দুঃখ। ‘তিন’ শব্দটি সংখ্যা নির্দেশক হলেও সর্ববিষয়ের প্রতিও প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু এখানে তা ‘দুঃখ’ শব্দ দ্বারা বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে। যেহেতু ‘দুঃখ’ প্রধান বিষয়, তাই তাকে ভিন্নভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, এবং সেই ভিন্নতার কারণে ষষ্ঠী বিভক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা উপকরণত্ব বা হেতুত্বের দ্যোতক। ‘ত্রয়’ অর্থাৎ দুঃখত্রয় বলতে ত্রিবিধ দুঃখকেই বোঝায়।

‘আক্রমণ’ বলতে সেই কারণকে বোঝায়, যার দ্বারা পীড়া বা ক্লেশ উৎপন্ন হয়।

প্রতিপক্ষ: তাহলে, এই ‘আক্রমণ’ বলতে কী বোঝায়?

পক্ষসমর্থক: চেতনাশক্তির সঙ্গে অন্তঃকরণের ঘনিষ্ঠ সংযোগই উক্ত ত্রিবিধ দুঃখের কারণ। অতএব ত্রিবিধ দুঃখের আক্রমণের ফলেই জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা জন্মগ্রহণ করে।
“আপনার প্রশ্ন— ‘কোন বিষয়কে লক্ষ্য করে জ্ঞানলাভের ইচ্ছা উদ্ভূত হয়?’— এর উত্তরে বলা হচ্ছে: তার উপশমকারী উপায়ের প্রতিই এই জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। উপশমকারী বলতে তাকেই বোঝায়, যা দুঃখকে উপশম বা প্রশমিত করে। ‘তদাপঘাতক’ শব্দটির অর্থ হলো— তার (দুঃখের) উপশমকারী।

প্রতিপক্ষ: নিষেধের কারণে ‘তদাপঘাতক’ শব্দে সমাস হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ষষ্ঠী বিভক্তিযুক্ত প্রত্যয়যুক্ত শব্দকে, যা কর্তা অর্থে ব্যবহৃত ‘তৃচ্’ ও ‘অক’ প্রত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত, সমাসবদ্ধ করা যায় না। অতএব সঠিক রূপ হবে ‘তস্যাপঘাতক’।

পক্ষসমর্থক: না, কারণ এই ধরনের ব্যবহার শাস্ত্রে প্রত্যক্ষভাবে দৃষ্ট হয়। ‘তৎপ্রযোজক হেতু’ এই প্রয়োগ শাস্ত্রে স্বীকৃত। ভাষ্যকারও বলেছেন ‘জাতিবাচকত্বাৎ’, অর্থাৎ জাতি বা সাধারণ শ্রেণিকে নির্দেশ করার ক্ষমতার কারণে। এখানে চূর্ণির আচার্যের লেখাতেও এই ধরনের ব্যবহারের উদাহরণ পাওয়া যায়। কখনো গুণ বস্তুটিকে বিশেষিত করে, আবার কখনো বস্তু গুণটিকে বিশেষিত করে। অতএব সাংখ্যকারিকার এই প্রয়োগ সম্পূর্ণ নির্দোষ ও শাস্ত্রসম্মত। সারকথা এই যে, ত্রিবিধ দুঃখে পীড়িত একজন ব্রাহ্মণ সেই দুঃখনিবারণের উপায় জানবার ইচ্ছা পোষণ করে এবং অনুসন্ধান করে— এমন কোন উপায় আছে যা ত্রিবিধ দুঃখকে প্রশমিত করতে পারে।

আরম্ভে ‘দুঃখ’ শব্দের ব্যবহার অশুভসূচকতা নির্দেশ করে না।

প্রতিপক্ষ: গ্রন্থের আরম্ভে ‘দুঃখ’ (misery) শব্দটি ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এর অর্থ অশুভ। যেসব শাস্ত্রের শুরুতে শুভ শব্দ থাকে সেগুলি প্রসিদ্ধ হয় (অর্থাৎ বিস্তার লাভ করে), এবং যারা সেগুলি পাঠ করে তারা খ্যাতিমান হয়; তদুপরি তাদের পূর্বসংস্কার শক্তভাবে প্রভাবিত হয় (অর্থাৎ শুভ প্রভাব দ্বারা সংস্কৃত হয়)। আশীর্বাদ বা মঙ্গলবাচনের দ্বারা পাঠক দ্রুত শাস্ত্রের অর্থ উপলব্ধি করে; কিন্তু ‘দুঃখ’ (misery) শব্দটি জাগতিক অর্থে অশুভসূচক। অতএব গ্রন্থের আরম্ভে এই শব্দটি দ্বারা শাস্ত্রের সূচনা করা উচিত নয়।

পক্ষসমর্থক: না, এর অর্থ অশুভ বলা সঙ্গত নয়, কারণ এখানে এটি বাক্যের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; স্বতন্ত্র একটি শব্দ হিসেবে এর প্রায় কোনো নির্দিষ্ট অর্থবহন ক্ষমতাই নেই। সম্পূর্ণ বাক্যই কোনো অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়, কারণ বাক্যই একটি বিশেষ নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। কিন্তু একটি স্বতন্ত্র শব্দ তা করে না। উপাদান শব্দসমূহ যে অর্থ প্রকাশ করে, তার থেকে ভিন্ন ও বিশেষ অর্থ বাক্যের মাধ্যমেই বোঝা যায়। একটি স্বতন্ত্র শব্দ তার সাধারণ অর্থের সীমা অতিক্রম করতে পারে না, তাই কোনো নির্দিষ্ট বিশেষ অর্থ প্রকাশে তা সক্ষম নয়। এই কারণেই তাকে অভিপ্রেত বিশেষ অর্থ প্রকাশে সক্ষম বলে গণ্য করা হয় না।

যেমন, ‘দেবদত্ত’ শব্দটি কর্তা বা কর্তৃরূপে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি যেকোনো ক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। কিন্তু বস্তু ও ক্রিয়াবাচক অন্যান্য শব্দের সাহায্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বোঝা যায় না। অনুরূপভাবে ‘গাম্’ ধাতু বস্তুবাচক, কারণ এটি সকল কর্তা ও সকল ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। একইভাবে ‘অভ্যাজ’ (তুমি নিয়ে এসো) একটি ক্রিয়া, কারণ এটি সকল কর্তা ও সকল কর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

যখন বলা হয়— “দেবদত্ত, সাদা গরুটি নিয়ে এসো”, তখন দেবদত্ত নিজেকে ‘গো’ (গরু) শব্দ দ্বারা নির্দেশিত বস্তুটির প্রতি কর্মরূপে নির্দিষ্ট করে নেয়, অন্য বস্তুগুলিকে বাদ দিয়ে। একই সঙ্গে ‘আনয়ন’ (নিয়ে আসা) ক্রিয়াটিও দেবদত্তের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, এবং অন্যান্য সকল কর্তা অপসারিত হয়। অর্থাৎ কর্তা ও কর্ম—উভয়ই আনয়নক্রিয়ার ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

‘শুক্ল’ (সাদা) এবং ‘গো’ (গরু) এই দুই শব্দের মধ্যে ‘শুক্ল’ শব্দটি সেই গরুটিকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে, যা সমস্ত গুণের আধার।

নিজস্ব আধার থেকে তাকে অন্যান্য গুণধর্ম থেকে পৃথক করে নির্দিষ্ট করার পরই তার বস্তুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ক্রমেই একটি বাক্যের বিশেষ অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বতন্ত্র শব্দসমূহ তাদের সাধারণ অর্থ থেকে বিচ্যুত না হলে নিরর্থকই থাকে, কারণ তারা কোনো বিশেষ অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। এ বিষয়ে আরও বলা হয়েছে— “যেমন ইন্দ্রিয়গুলির কার্য, যাদের নিজ নিজ স্বভাব ও নিজ নিজ বিষয়বস্তু আছে, দেহ ব্যতীত প্রত্যক্ষ হয় না; তেমনি পৃথক পৃথক শব্দ, যারা নিজ নিজ বিশেষ অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত, তারা বাক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হলে অর্থবহ হয় না।”

যদি এমনই অবস্থা হয়, তবে ‘দুঃখ’ (misery) শব্দ দ্বারা প্রকাশিত অর্থকে আপনি কীভাবে অশুভ বলে নির্ধারণ করবেন? বিশেষত যখন এখনো এই বিষয়ে সন্দেহ থাকে যে শব্দটি তার নিজস্ব অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, না কি দুঃখনিবারণের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বাক্য দ্বারা যে অর্থ প্রকাশিত হয়, তা শুভই, কারণ তা দুঃখ পরিহারের অর্থে ব্যবহৃত। যে বাক্য দুঃখ পরিহারের অর্থে ব্যবহৃত হয়, সেটি শুভার্থবাচক বলেই প্রতীয়মান হয়; যেমন— “রোগ দূর হোক” এবং “দারিদ্র্য না থাকুক।” এই বাক্যগুলিও দুঃখনিবারণের অর্থেই ব্যবহৃত, সুতরাং তারা শুভার্থই প্রকাশ করে। অতএব, আপনার এই বক্তব্য যে ‘দুঃখ’ শব্দটি গ্রন্থের শুরুতে ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ তা অশুভার্থবাচক— তা ভ্রান্ত।

কারণ, কারণসমূহের অনন্ততার ভিত্তিতে যদি জাগতিক পদার্থের উপাদানসমূহের (অর্থাৎ উদ্দীপক ও গতিশীল গুণ, রাজস) অনন্ততাকে স্বীকার করা হয়, তবে অনভিপ্রেত ও অবাঞ্ছিত জটিলতার সৃষ্টি হবে।

শরীরগত দুঃখ দুই প্রকার— শারীরিক ও মানসিক। শারীরিক দুঃখ বায়ু, পিত্ত ও কফের বিকার থেকে উৎপন্ন হয়। আর মানসিক দুঃখ জন্মায় কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, বিষাদ, ভয়, ঈর্ষা, অপরের সুখে অসন্তোষ, বিতৃষ্ণা বা উৎকণ্ঠা এবং কোনো বিশেষ বিষয় লাভ না হওয়ার কারণে। ভৌতিক দুঃখ মানুষের দ্বারা, পশু, হরিণ, পক্ষী, সরীসৃপ ও অন্যান্য অচেতন বস্তুর দ্বারা উৎপন্ন হয়। আর অধিদৈবিক দুঃখ— অর্থাৎ বিধানের অধীন থেকে উদ্ভূত দুঃখ— সৃষ্টি হয় অতিশয় শীত, তাপ, ঝড়, বৃষ্টি, শনি গ্রহের প্রভাব ও শিশিরবিন্দুর দ্বারা।

যদি কারণের ভিন্নতার ভিত্তিতে দুঃখত্রয় স্বীকার করা হয়, তবে জাগতিক পদার্থের উপাদানসমূহের (অর্থাৎ উদ্দীপক ও গতিশীল গুণ, রাজস) অনন্ততাকেও স্বীকার করতে হয়, ফলে অনভিপ্রেত জটিলতার সৃষ্টি হয়। এটি স্পষ্টতই কাম্য নয়। অতএব, উপকরণের ভিন্নতার ভিত্তিতে দুঃখত্রয়ের স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

পক্ষসমর্থক: আপনি যে বলেছেন, উদ্দীপক ও গতিশীল গুণ (রাজস)-এর ঐক্যের কারণে দুঃখত্রয়ের প্রকৃত স্বতন্ত্রতা নেই, কিন্তু কারণের ভিন্নতার ভিত্তিতে তাকে রূপকার্থে (রূপকভাবে) ত্রিবিধ বলা হয়— এই বক্তব্যটি সঠিক। কিন্তু আপনি যে আরও বলেছেন, কারণসমূহের অনন্ততার জন্য উদ্দীপক ও গতিশীল গুণ (রাজস)-এর অনন্ততাকে স্বীকার করতে হবে এবং তাতে অনভিপ্রেত জটিলতার সৃষ্টি হবে— এই বক্তব্যটি ভুল।

কেন?

কারণ ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এইরূপ শ্রেণিবিন্যাস বা বিভাগীকরণের একটি যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থাকে, যেমন বর্ণসংখ্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বর্ণ চারটি, যদিও পৈপ্পলাদ প্রভৃতি বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে, তবুও সেই ভেদ অতিরিক্ত কোনো নতুন বর্ণসংখ্যা সৃষ্টি করে না, কারণ তারা ব্রাহ্মণত্ব প্রভৃতি মূল বর্ণস্বরূপ থেকে পৃথক নয়। আবার বর্ণসমূহের মধ্যে সাধারণ বর্ণত্বের সঙ্গে অ-পার্থক্যের কারণেও বর্ণের একত্ব স্বীকার করা হয় না।

অনুরূপভাবে, দুঃখের সংখ্যা তিন— যদিও দেহগত, মানসিক প্রভৃতি রূপভেদ রয়েছে, তবুও এর ফলে দুঃখের কোনো অতিরিক্ত সংখ্যা সৃষ্টি হয় না, কারণ এই দুঃখসমূহ দেহজাত দুঃখ থেকে ভিন্ন কোনো নতুন স্বরূপ নয়। আবার সাধারণ দুঃখত্বের সঙ্গে অ-পার্থক্যের কারণেও দুঃখের একত্ব স্বীকার করতে হয় না। উপরন্তু, আপনিই স্বীকার করেছেন যে দুঃখের ভেদ কারণের ভেদের জন্যই, এবং তা রূপকার্থক বা উপচারমূলক। আর যেহেতু এই রূপকার্থ বাস্তব নয়, অতএব এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ভুল প্রশ্ন বা অযথা জেদ করা উচিত নয়।

দৃষ্টবদানুশ্রবিকঃ স হ্যবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ ।
তদ্বিপরীতঃ শ্রেয়ান্ ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ

॥ ২॥

দৃষ্টবৎ : প্রত্যক্ষের মতো, প্রত্যক্ষোপায়ের সদৃশ
অনুশ্রবিকঃ : শ্রুতিভিত্তিক, শাস্ত্রশ্রুতিজনিত, পরলোকফল-নির্ভর
সঃ : সেই (উপায়টি)
হি : কারণ
অবিশুদ্ধি : অশুদ্ধতা, মলিনতা
ক্ষয় : ক্ষয়, নাশ, লয়
অতিশয় : অতিশয়তা, বৃদ্ধি, সীমা অতিক্রম
যুক্তঃ : যুক্ত, সংযুক্ত, অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত
তৎ : সেই (দৃষ্ট ও অনুশ্রবিক উপায়)
বিপরীতঃ : তার থেকে ভিন্ন, বিপরীত প্রকৃতির
শ্রেয়ান্ : শ্রেষ্ঠ, অধিক কল্যাণকর
ব্যক্ত : প্রকাশিত অবস্থা, স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান বিষয়
অব্যক্ত : অপ্রকাশিত অবস্থা, অপ্রতীয়মান বিষয়
জ্ঞ : জ্ঞাতা, যে জানে
বিজ্ঞানাত্ : বিশেষ জ্ঞান থেকে, অন্তরঙ্গ জ্ঞান থেকে

দুঃখনিবারণের জন্য শাস্ত্রসমর্থিত উপায়ও সমানভাবে অকার্যকর; কারণ তা অশুদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত, এবং তার ফল না স্থায়ী, না সকলের ক্ষেত্রে একইরূপ। সুতরাং তার থেকে ভিন্ন এবং তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ হলো সেই উপায়, যা ব্যক্ত, অব্যক্ত ও জ্ঞ-এর অন্তরঙ্গ বিশেষ জ্ঞান থেকে প্রাপ্ত হয়।

গৌড়পাদ ভাষ্য

যদি দৃষ্টাদন্যত্র জিজ্ঞাসা কার্য্যা, ততো’পি নৈব। যৎ আনুশ্রবিকো হেতুঃ দুঃখত্রয়াভিঘাত্তকঃ।
অনুশ্রুয়ত ইত্যনুশ্রবঃ, তত্র ভব আনুশ্রবিকঃ। স চ আগমাৎ সিদ্ধঃ। যথা—
আপাম সোমমমৃতা অভূমাগন্ম জ্যোতিরবিদাম দেবান্।
কিন্নুনমস্মান্ কৃণবদরাতিঃ কিমু ধূর্তিরমৃতমর্ত্যস্য॥

শব্দার্থ

যদি : যদি, শর্তস্বরূপ, দৃষ্টাত্ : প্রত্যক্ষ উপায় থেকে, ইন্দ্রিয়গোচর উপায় থেকে, অন্যত্র : অন্যত্র, ভিন্ন উপায়ে, জিজ্ঞাসা : অনুসন্ধান, অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞানলাভের ইচ্ছা, কার্য্যা : করা উচিত, কর্তব্য, ততো’পি : তবুও, তাতেও, নৈব : নয়ই, মোটেই নয়, যৎ : কারণ যে, যেহেতু, আনুশ্রবিকঃ : শ্রুতিনির্ভর, আগমনির্ভর, শাস্ত্রবিহিত, হেতুঃ : কারণ, উপায়, নিমিত্ত, দুঃখত্রয় : ত্রিবিধ দুঃখ (আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক), অভিঘাত্তকঃ : নাশকারী, আঘাতকারী, অপসারক, অনুশ্রুয়তে : ক্রমান্বয়ে শোনা হয়, শ্রবণের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়, ইতি : এই অর্থে, এইভাবে, অনুশ্রবঃ : শ্রুতি, ধারাবাহিক শ্রবণ, শাস্ত্রবাণী, তত্র : সেখানে, সেই ক্ষেত্রে, ভবঃ : উৎপন্ন, সম্পর্কযুক্ত, অবস্থিত, আনুশ্রবিকঃ : অনুশ্রবজাত, শ্রুতিনির্ভর, শাস্ত্রসম্বন্ধীয়, সঃ : সেটি, সেই, : এবং, আরও, আগমাৎ : আগম থেকে, বেদ/শাস্ত্র থেকে, সিদ্ধঃ : প্রতিষ্ঠিত, প্রমাণিত, স্বীকৃত, আপাম : পান করেছি, গ্রহণ করেছি, সোমম্ : সোমরস, যজ্ঞীয় পানীয়, অমৃতাঃ : অমর, অমৃতস্বরূপ, অভূম : হয়েছি, পরিণত হয়েছি, আগন্ম : পৌঁছেছি, লাভ করেছি, জ্যোতিঃ : আলো, তেজ, দীপ্তি, অবিদাম : জেনেছি, উপলব্ধি করেছি, দেবান্ : দেবতাদের, দিব্য সত্তাদের, কিম্ : কী, কীই বা, নু : তবে, সত্যিই, নমঃ : এখন, নিশ্চয়ই (প্রসঙ্গসূচক), অস্মান্ : আমাদের, আমাদের প্রতি, কৃণবৎ : করতে পারে, সাধন করতে পারে, অরাতিঃ : শত্রু, অনিষ্টকারী, কিম্ উ : কীই বা, কীভাবে, ধূর্তিঃ : ক্ষয়, অনিষ্ট, বিপদ, অমৃত : অমর, নিত্য, মর্ত্যস্য : নশ্বরের, মানুষের

যদি প্রত্যক্ষ বা দৃশ্যমান (দৃষ্ট) উপায় ব্যতিরেকে অন্য কোনো উপায়ের অনুসন্ধান করতে হয়, তবেও উত্তর হবে ‘না’; কারণ শাস্ত্রে বর্ণিত উপায়সমূহ ত্রিবিন দুঃখ দূর করতে সক্ষম। পরম্পরাগতভাবে যা শ্রুত হয় তা-ই হলো ‘অনুশ্রব’, এবং সেই অনুশ্রব বা শাস্ত্রে যা প্রকাশিত হয়েছে তা-ই ‘আনুশ্রবিক’ বা শাস্ত্রীয়। এটি বেদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বা প্রমাণিত। যেমন বলা হয়েছে: “আমরা সোমরস পান করেছি এবং অমর হয়েছি; আমরা দিব্য জ্যোতির সন্ধান পেয়েছি এবং দেবতাদের জেনেছি। এখন শত্রুরা আমাদের কী ক্ষতিই বা করতে পারে? মরণশীল জরা বা বিনাশ কীভাবে অমরত্বকে প্রভাবিত করবে?”


কদাচিদিন্দ্রাদীনাং দেবানাং কল্প আসীত্ । কথং বযমমৃতা অভূমেতি বিচার্যামুংযস্মাদ্বযমপাম সোমং পীতবন্তঃ সোমং তস্মাদমৃতা অভূম অমরা ভূতবন্ত ইত্যর্থঃ । কিংচ অগন্ম জ্যোতিঃ গতবন্তো লব্ধবন্তো জ্যোতিঃ স্বর্গমিতি । অবিদাম দেবান্ দিব্যান্ বিদিতবন্তঃ ।

শব্দার্থ

কদাচিত্ : কোনো এক সময়ে, একদা ইন্দ্রাদীনাং : ইন্দ্র প্রমুখ, ইন্দ্র আদি করে দেবানাং : দেবতাদের, দেবগণের কল্পঃ : বিচার, ভাবনা, সংকল্প, মানসিক আলোচনা আসীত্ : ছিল, হয়েছিল কথং : কীভাবে, কোন প্রকারে বযং : আমরা অমৃতাঃ : অমর, মরণহীন অভূম : হয়েছি, হলাম ইতি : এই প্রকার, এইভাবে (উদ্ধৃতি বা চিন্তার সমাপ্তি নির্দেশক) বিচার্য : বিবেচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে অমুং : একে, এই বিষয়টিকে যস্মাদ : যেহেতু, যে কারণ থেকে বযং : আমরা অপাম : পান করেছি সোমং : সোমরসকে পীতবন্তঃ : পান করেছি, পানকারী হয়েছি তস্মাদ : সেই হেতু, সেই কারণ থেকে, তা থেকে অমৃতাঃ : অমর অভূম : হয়েছি অমরাঃ : মৃত্যুহীন, দেবত্বপ্রাপ্ত ভূতবন্তঃ : হয়েছি, পরিণত হয়েছি ইত্যর্থঃ : এই হলো অর্থ, অর্থাৎ কিংচ : আরও, অধিকন্তু অগন্ম : লাভ করেছি, প্রাপ্ত হয়েছি, গমন করেছি জ্যোতিঃ : আলো, দিব্য জ্যোতি গতবন্তঃ : প্রাপ্ত হয়েছি, পৌঁছেছি লব্ধবন্তঃ : অর্জন করেছি, পেয়েছি স্বর্গমিতি : স্বর্গে বা স্বর্গলোককে (ইতি – এইভাবে) অবিদাম : জেনেছি, চিনেছি, বিঁদধাতু নিষ্পন্ন ক্রিয়া দেবান্ : দেবতাদের দিব্যান্ : দিব্য, স্বর্গীয়, অলৌকিক বিদিতবন্তঃ : অবগত হয়েছি, বিদিত হয়েছি

একদা ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাদের মধ্যে এই আলোচনা হয়েছিল যে, ‘আমরা কীভাবে অমর হলাম?’ এবং গভীরভাবে বিচার-বিবেচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন: যেহেতু আমরা সোমরস পান করেছি, তাই আমরা অমর হয়েছি। এছাড়া, আমরা দিব্য জ্যোতির সন্ধান পেয়েছি এবং স্বর্গলোক লাভ করেছি। আমরা দিব্য দেবতাদের চিনেছি।


এবং চ কিন্নূনমস্মান্ কৃণবত্ অরাতিঃ, নূনং নিশ্চিতং কিং অরাতিঃ শত্রুরস্মান্ কৃণবত্ কর্তেতি । কিমু ধূর্তিরমৃতমর্ত্যস্য, ধূর্তির্জরা হিংসা বা কিং করিষ্যতি অমৃতমর্ত্যস্য । অন্যচ্চ বেদে শ্রূযতে আত্যন্তিকং ফলং পশুবধেন — ‘সর্বাঁল্লোকাঞ্জযতি মৃত্যুং তরতি পাপ্মানং তরতি ব্রহ্মহত্যাং তরতি যো যোঽশ্বমেধেন যজতে ইতি । একান্তাত্যন্তিকে এবং বেদোক্তে অপার্থৈব জিজ্ঞাসা — ইতি ন । উচ্যতে —

শব্দার্থ

এবং চ : আর এইভাবে, এবং কিন্নুনমস্মান : আমাদের কীই বা (ক্ষতি) কৃণবদ্ – করবে, অরাতিঃ – শত্রু নূনং : নিশ্চয়ই, অবশ্যই নিশ্চিতং : সুনিশ্চিতভাবে কিং : কী অরাতিঃ : শত্রু শত্রুরস্মান্ : শত্রু আমাদের প্রতি কৃণবত্ : করবে কর্তেতি : করবে এই অর্থে (কর্তা + ইতি) কিমু : কী বা ধূর্তিরমৃতমর্ত্যস্য : মরণশীলকে জরা বা হিংসা কীভাবে অমর করবে (বিদ্রূপার্থে) ধূতিঃ : জরা বা হিংসা জরা : বার্ধক্য হিংসা : বিনাশ বা ক্ষতি বা : অথবা করিষ্যতি : করবে অমৃতমর্ত্যস্য : অমর মরণশীলকে অন্যচ্চ : আরও, এছাড়া বেদে : বেদে, শ্রুতিতে শ্রূয়তে : শোনা যায় আত্যন্তিকং : পরম, চরম, চূড়ান্ত ফলং : ফল, প্রাপ্তি পশুবধেন : পশুবলির দ্বারা (যজ্ঞে) সর্বাঞ্ : সমস্ত, সকল লোকান্ : লোকসমূহকে, ভুবনসমূহকে জয়তি : জয় করে মৃত্যুং : মৃত্যুকে তরতি : অতিক্রম করে, পার হয় পাপ্মানং : পাপসমূহকে ব্রহ্মহত্যাং : ব্রহ্মহত্যার পাপকে যো যো : যে কেউ, যারা যারা অশ্বমেধেন : অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারা যজতে : যজ্ঞ সম্পাদন করে ইতি : এই প্রকার, এইভাবে একান্তাত্যান্তিকে : একান্ত ও আত্যন্তিক (দুঃখ নিবৃত্তি) এবং : এই প্রকার বেদোক্তে : বেদে উক্ত বা কথিত হলে অপার্থৈব : নিরর্থকই, প্রয়োজনহীনই (অপার্থ – নিরর্থক, এব – ই) জিজ্ঞাসা : অনুসন্ধান, তত্ত্বজিজ্ঞাসা ইতি ন : তা নয় উচ্যতে : (উত্তরে) বলা হচ্ছে

“প্রকৃতপক্ষে শত্রুরা আমাদের কী অপকার করতে পারে? মরণশীল জরা বা বিনাশ কীভাবে অমরকে প্রভাবিত করবে?”… এছাড়া বেদে শোনা যায় যে, পশুবলির (যজ্ঞের) মাধ্যমে আত্যন্তিক বা পরম ফল লাভ করা যায়— ‘যিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, তিনি সকল লোক জয় করেন, মৃত্যুকে অতিক্রম করেন, পাপমুক্ত হন এবং এমনকি ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকেও নিস্তার পান’। যদি বেদে এইভাবে একান্ত ও আত্যন্তিক প্রতিকারের কথা বলাই থাকে, তবে (তত্ত্ববিদ্যার) এই অনুসন্ধান তো নিরর্থক— না, বিষয়টি তেমন নয়। এর উত্তরে বলা হচ্ছে—


দৃষ্টবদানুশ্রবিক ইতি । দৃষ্টেন তুল্যো দৃষ্টবৎ । যোঽসৌ আনুশ্রবিকঃ কস্মাৎ স দৃষ্টবৎ, যস্মাৎ— অবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ ।
অবিশুদ্ধিয়ুক্তঃ পশুঘাতাৎ । তথা চোক্তম্ । ষট্ শতানি নিয়ুজ্যন্তে পশূনাং মধ্যমেঽহনি ।
অশ্বমেধস্য বচনাদূনানি পশুভিস্ত্রিভিঃ ॥ যদ্যপি শ্রুতিস্মৃতিবিহিতো ধর্মস্তথাপি মিশ্রীভাবাদবিশুদ্ধিয়ুক্ত ইতি । যথা—

শব্দার্থ

দৃষ্টবদানুশ্রবিক : দৃষ্টের (প্রত্যক্ষ উপায়ের) ন্যায় আনুশ্রবিক (বৈদিক/শাস্ত্রীয়) উপায় ইতি : এই কথা (কারিকার অংশ বিশেষ) দৃষ্টেন : দৃষ্টের বা প্রত্যক্ষের সাথে তুল্যঃ : সমান, সদৃশ দৃষ্টবৎ : দৃষ্টের মতো, প্রত্যক্ষ উপায়ের ন্যায় কোঽসৌ / যোঽসৌ : কোনটি সেই / যে সেই (আনুশ্রবিক উপায়) আনুশ্রবিকঃ : শ্রুতিবিহিত বা শাস্ত্রীয় উপায় কস্মাত্ : কেন, কি কারণে স দৃষ্টবৎ : তা দৃষ্টের মতো (ত্রুটিপূর্ণ) যস্মাত্ : যেহেতু, যে কারণ থেকে অবিশুদ্ধি-ক্ষয়-াতিশয়-যুক্তঃ : অশুদ্ধি, ক্ষয় এবং অতিশয় (তারতম্য) দোষে যুক্ত অবিশুদ্ধি-যুক্তঃ : অপবিত্রতা বা অশুদ্ধি সম্পন্ন পশুঘাতাত্ : পশুবধের কারণে, যজ্ঞে পশু হত্যার দরুন তথা চ : এবং সেই রূপ উক্তম্ : বলা হয়েছে (শাস্ত্রে) ষট্ শতানি : ছয়শত নিযুজ্যন্তে : নিয়োগ বা বলি দেওয়া হয় পশূনাম্ : পশুদের মধ্যমেঽহনি : (যজ্ঞের) মধ্যম দিনে অশ্বমেধস্য : অশ্বমেধ যজ্ঞের বচনাত্ : বিধান বা শাস্ত্রীয় বচন অনুসারে ঊনানি : কম পশুভিঃ ত্রিভিঃ : তিন জন পশুর দ্বারা (অর্থাৎ ৫৯৭টি পশু) যদ্যপি : যদিও শ্রুতি-স্মৃতি-বিহিতঃ : বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্র দ্বারা অনুমোদিত বা বিহিত ধর্মঃ : পুণ্যকর্ম বা ধর্মীয় আচার তথাপি : তবুও, তৎসত্ত্বেও মিশ্রীভাবাত্ : (হিংসার সাথে) মিশ্রিত থাকার কারণে ইতি : এই প্রকার যথা: যেমন

“‘দৃষ্টবৎ আনুশ্রবিক’—এইরূপ বলা হয়েছে।
যা প্রত্যক্ষের সঙ্গে তুল্য, তাকেই ‘দৃষ্টবৎ’ বলা হয়।
যে এই আনুশ্রবিক (শ্রুতিভিত্তিক উপায়), তা কেন দৃষ্টবতের ন্যায়?
কারণ তা অবিশুদ্ধি, ক্ষয় ও অতিশয়ের সঙ্গে যুক্ত। এটি পশুহত্যার কারণে অবিশুদ্ধিযুক্ত। এবং এ বিষয়ে বলা হয়েছে—
‘মধ্যাহ্নকালে পশুদের মধ্যে ছয় শত পশু নিয়োজিত করা হয়;
অশ্বমেধের বিধান অনুসারে তিনটি পশু কম।’ যদিও ধর্ম শ্রুতি ও স্মৃতির দ্বারা বিধৃত, তবুও মিশ্রভাবের কারণে তা অবিশুদ্ধিযুক্ত—এইরূপ বলা হয়। যেমন—”


বহূনীন্দ্রসহস্রাণি দেবানাং চ যুগে যুগে কালেন সমতীতানি কালো হি দুরতিক্রমঃ ॥ এবমিন্দ্রাদিনাশাৎ ক্ষয়যুক্তঃ । তথাঽতিশয়ো বিশেষস্তেন যুক্তঃ ।
বিশেষগুণদর্শনাদিতরস্য দুঃখং স্যাদিতি । এবমানুশ্রবিকোঽপি হেতুর্দৃষ্টবৎ ॥ কস্তর্হি শ্রেয়ানিতি চেৎ । উচ্যতে । তদ্বিপরীত: শ্রেয়ান্ তাভ্যাং দৃষ্টানুশ্রবিকাভ্যাং বিপরীত: শ্রেয়ান্ প্রশস্যতর ইতি । ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ তত্র ব্যক্তং মহদাদিবুদ্ধিরহঙ্কার: পঞ্চতন্মাত্রাণি একাদশেন্দ্রিয়াণি পঞ্চমহাভূতানি । অব্যক্তং প্রধানং । জ্ঞ: পুরুষ: ।
এবমেতানি পঞ্চবিংশতি তত্বানি ব্যক্তাব্যক্ত্ঞানি কথ্যনে এতদ্বিজ্ঞানাচ্ছ্রেয় ইত্যুক্তং চ পঞ্চবিংশতি তত্ত্বজ্ঞ ইতি | অথ ব্যক্তাব্যক্তজ্নানানং কো বি শেষ ইত্যুছ্যতে ||

শব্দার্থ

বহূনীন্দ্রসহস্রাণি : বহু সহস্র ইন্দ্র দেবানাং চ : এবং দেবতাদের যুগে যুগে : যুগে যুগে কালেন : কালক্রমে বা সময়ের প্রভাবে সমতীতানি : অতিক্রান্ত হয়েছে বা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে কালো হি : কাল বা সময় নিশ্চয়ই দুরতিক্রমঃ : অলঙ্ঘনীয় বা যা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য এবমিন্দ্রাদিনাশাৎ : এইভাবে ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাদের বিনাশ হওয়ার কারণে ক্ষয়যুক্তঃ : ক্ষয়শীল বা বিনাশশীল তথা : অধিকন্তু বা এবং সেইরূপ অতিশয়ঃ : উৎকর্ষজনিত তারতম্য দোষ বিশেষঃ : বিশেষ বৈশিষ্ট্য তেন : তার দ্বারা যুক্তঃ : যুক্ত বিশেষগুণদর্শনাৎ : অন্যের বিশেষ গুণ বা সুখের আধিক্য দেখার ফলে ইতরস্য : অন্য ব্যক্তির বা অপরের দুঃখং : মানসিক যাতনা বা কষ্ট স্যাদিতি : উৎপন্ন হয় (ইতি—এইভাবে) এবমানুশ্রবিকোঽপি : এইভাবে শাস্ত্রীয় বা বৈদিক উপায়টিও হেতুঃ : মাধ্যম বা উপায় দৃষ্টবৎ : লৌকিক বা প্রত্যক্ষ উপায়ের ন্যায় (ত্রুটিপূর্ণ) কস্তর্হি : তাহলে কোনটি? শ্রেয়ানিতি : শ্রেয় বা অধিকতর মঙ্গলকর (ইতি—এই জিজ্ঞাসা) চেৎ : যদি উচ্যতে : (উত্তরে) বলা হচ্ছে তদ্বিপরীতঃ : তাদের (লৌকিক ও বৈদিক উপায়ের) বিপরীত শ্রেয়ান্ : শ্রেষ্ঠ বা মোক্ষদায়ক তাভ্যাং : সেই দুটি (দৃষ্ট ও আনুশ্রবিক) হতে দৃষ্টানুশ্রবিকাভ্যাং : লৌকিক ও বৈদিক উপায়দ্বয় হতে বিপরীতঃ : ভিন্ন বা স্বতন্ত্র প্রশস্যতরঃ : অধিকতর প্রশংসনীয় ইতি : এই প্রকার ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ : ব্যক্ত, অব্যক্ত এবং জ্ঞ-এর বিশেষ জ্ঞান থেকে তত্র : তার মধ্যে ব্যক্তং : প্রকাশিত রূপ বা প্রকৃতির বিকার মহদাদিবুদ্ধিঃ : মহৎ বা বুদ্ধি প্রভৃতি অহঙ্কারঃ : অহংকার তত্ত্ব পঞ্চতন্মাত্রাণি : পাঁচটি সূক্ষ্ম ভূতাবস্থা একাদশেন্দ্রিয়াণি : এগারোটি ইন্দ্রিয় পঞ্চমহাভূতানি : পাঁচটি স্থূল মহাভূত অব্যক্তং : অপ্রকাশিত অবস্থা বা মূল প্রকৃতি প্রধানং : প্রধান বা মূল সত্তা জ্ঞঃ : জ্ঞাতা বা পুরুষ পুরুষঃ : পরম চৈতন্য বা আত্মা এবমেতানি : এইভাবে এই সকল পঞ্চবিংশতি : পঁচিশটি তত্ত্বানি : মূল উপাদান বা তত্ত্ব ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞানি : ব্যক্ত, অব্যক্ত ও জ্ঞ তত্ত্বসমূহ কথ্যন্তে : বলা হয় এতদ্বিজ্ঞানাৎ : এই পঁচিশটি তত্ত্বের সম্যক জ্ঞান থেকে শ্রেয়ঃ : মুক্তি বা পরম কল্যাণ ইত্যুক্তং চ : এইভাবে বলা হয়েছে যে পঞ্চবিংশতি তত্ত্বজ্ঞ : পঁচিশটি তত্ত্বের প্রকৃত জ্ঞাতা অথ — এরপর, অতঃপর, এবার ব্যক্ত — প্রকাশিত, প্রত্যক্ষ, স্পষ্ট
অব্যক্ত — অপ্রকাশিত, অপ্রত্যক্ষ, সূক্ষ্ম জ্ঞানানং — জ্ঞানসমূহের, জ্ঞানের (ষষ্ঠী বহুবচন)
কঃ — কে, কী বিশেষঃ — বিশেষত্ব ইতি — এইভাবে, এই অর্থে উচ্যতে — বলা হয়, বলা হচ্ছে

যুগে যুগে সহস্র সহস্র ইন্দ্র এবং অন্যান্য দেবতারা সময়ের প্রভাবে বিলীন হয়ে গেছেন; কারণ কাল বা সময়কে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য। এইভাবে ইন্দ্রাদির বিনাশ হওয়ার কারণে বৈদিক ফল ‘ক্ষয়যুক্ত’ বা বিনাশশীল। আবার অন্যের বিশেষ গুণ বা সুখ দর্শনে অপরের দুঃখ উৎপন্ন হওয়ার কারণে এটি ‘অতিশয়’ বা বৈষম্য দোষে যুক্ত। তাহলে শ্রেষ্ঠ উপায় কোনটি? লৌকিক ও বৈদিক—এই উভয় উপায়ের বিপরীত পথই শ্রেষ্ঠ এবং অধিকতর প্রশংসনীয়, কারণ এটি অশুদ্ধি, বিনাশ বা বৈষম্যের সাথে যুক্ত নয়। এটি ব্যক্ত, অব্যক্ত এবং জ্ঞ-এর স্বরূপ জ্ঞান থেকে অর্জিত হয়। এখানে ‘ব্যক্ত’ বলতে মহৎ (বুদ্ধি), অহংকার, পাঁচটি তন্মাত্র, এগারোটি ইন্দ্রিয় এবং পাঁচটি মহাভূতকে বোঝায়। ‘অব্যক্ত’ হলো প্রকৃতি এবং ‘জ্ঞ’ হলো পুরুষ বা আত্মা। এই পঁচিশটি তত্ত্বের সম্যক জ্ঞান থেকেই পরম কল্যাণ সম্ভব, এইভাবে বলা হয়েছে— ‘যিনি পঁচিশটি তত্ত্ব জানেন’ ইত্যাদি। এখন আমরা ব্যক্ত (প্রকাশিত), অব্যক্ত (অপ্রকাশিত) এবং জ্ঞাতা—এই তিনটির বিশেষ লক্ষণসমূহ ব্যাখ্যা করছি।

যুক্তিদীপিকা

মূলপ্রকৃতিরবিকৃতির্মহদাদ্যাঃ প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ সপ্ত ।
ষোড়শকস্তু বিকারো ন প্রকৃতির্ন বিকৃতিঃ পুরুষঃ
॥ ৩॥

মূলপ্রকৃতিঃ — আদি প্রকৃতি, মূল কারণ, প্রধান তত্ত্ব, জগতের মৌলিক উৎস
অবিকৃতিঃ — কার্য নয়, পরিবর্তনরহিত, যা অন্য কিছুর থেকে উৎপন্ন নয়, অনুৎপাদ্য
মহদাদ্যাঃ — মহৎ (বুদ্ধি) ও তদনন্তর উৎপন্ন তত্ত্বসমূহ
প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ — যা একই সঙ্গে কারণ ও কার্য, প্রকৃতি ও বিকৃতি উভয়ই
সপ্ত — সাতটি
ষোড়শকঃ — ষোলোটি তত্ত্বের সমষ্টি, ষোলো সংখ্যক বিকারসমূহ
তু — কিন্তু, পক্ষান্তরে, তবে
বিকারঃ — কেবল কার্য, পরিবর্তিত অবস্থা, উৎপন্ন তত্ত্ব
— না, নয়
প্রকৃতিঃ — কারণ, উৎস, উৎপাদক তত্ত্ব
বিকৃতিঃ — কার্য, বিকার, উৎপন্ন বস্তু
পুরুষঃ — আত্মা, দ্রষ্টা, সাক্ষী, বিশুদ্ধ চৈতন্য, যা না কারণ না কার্য

মূল প্রকৃতি, সবকিছুর মূল, কোনো উৎপন্ন বস্তু নয়; মহৎ(বুদ্ধি) হতে শুরু করে সাতটি তত্ত্ব (মহৎ, অহংকার , শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) একই সাথে উৎপন্ন বস্তু এবং উৎপাদক; ষোলোটি তত্ত্ব (পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি তন্মাত্র এবং মন) কেবলই উৎপন্ন বস্তু এবং উৎপাদক নয়; পুরুষ, আত্মা, কোনো উৎপন্ন বস্তুও নয় এবং উৎপাদকও নয়।

গৌড়পাদ ভাষ্য

মুলপ্রকৃতিঃ প্রধানং। প্রকৃতিত্বিকৃতিসপ্তকস্য মূলভূতত্বাৎ । মূলং চ সা প্রকৃতিশ্চ মূলপ্রকৃতিরবিকৃতিঃ । অন্যস্মান্নোৎপদ্যতে তেন প্রকৃতিঃ কস্যচিদ্বিকারো ন ভবতি । মহদাদ্যাঃ প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ সপ্ত । মহান্ বুদ্ধিঃ । বুদ্ধ্যাদ্যাঃ সপ্ত—বুদ্ধিঃ ১, অহঙ্কারঃ ২, পঞ্চ তন্মাত্রাণি ৩ । এতাঃ সপ্ত প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ । তদ্যথা—প্রধানাদ্ বুদ্ধিরুৎপদ্যতে তেন বিকৃতিঃ প্রধানস্য বিকার ইতি, সৈবাহঙ্কারমুৎপাদয়তি অতঃ প্রকৃতিঃ ।

শব্দার্থ

মূলপ্রকৃতিঃ, মূলপ্রকৃতি, আদি সত্তা। প্রধানং, প্রধান, আদি কারণ। প্রকৃতিত্বিকৃতিসপ্তকস্য, সাতটি প্রকৃতি ও বিকৃতির (অর্থাৎ যা কারণ ও কার্য উভয়ই)। মূলভূতত্বাৎ, মূল হওয়ার কারণে, ভিত্তি হওয়ার হেতু। মূলং, মূল, আধার। , এবং, ও। সা, সেই। প্রকৃতিশ্চ, এবং প্রকৃতি। মূলপ্রকৃতিরবিকৃতিঃ, মূলপ্রকৃতি হলো অবিকৃতি (অর্থাৎ যা অন্য কিছু থেকে উৎপন্ন নয়)। অন্যস্মান্নোৎপদ্যতে, অন্য কিছু থেকে উৎপন্ন হয় না। তেন, সেই কারণে, সেই হেতু। প্রকৃতিঃ, প্রকৃতি, মূল কারণ। কস্যচিদ্বিকারো, কোনো কিছুর বিকার বা কার্য। , না। ভবতি, হয়। মহদাদ্যাঃ, মহৎ (বুদ্ধি) প্রভৃতি। প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ, প্রকৃতি ও বিকৃতি (যা একই সাথে কারণ ও কার্য)। সপ্ত, সাত, সাতটি। মহান্, মহৎ তত্ত্ব। বুদ্ধিঃ, বুদ্ধি। বুদ্ধ্যাদ্যাঃ, বুদ্ধি প্রভৃতি। অহঙ্কারঃ, অহঙ্কার, অভিমান। পঞ্চ, পাঁচ, পাঁচটি। তন্মাত্রাণি, তন্মাত্রসমূহ (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)। এতাঃ, এইগুলি। তদ্যথা, যথা, যেমন, উদাহরণস্বরূপ। প্রধানাদ্, প্রধান (মূলপ্রকৃতি) থেকে। বুদ্ধিরুৎপদ্যতে, বুদ্ধি উৎপন্ন হয়। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। প্রধানস্য, প্রধানের। বিকার, বিকার, রূপান্তর। ইতি, এই প্রকার, এইভাবে। সৈবাহঙ্কারমুৎপাদয়তি, সেই বুদ্ধিই অহঙ্কারকে উৎপন্ন করে। অতঃ, অতএব, সেই কারণে। প্রকৃতিঃ, প্রকৃতি, কারণ।

প্রধান হলো আদি প্রকৃতি, যেহেতু এটি সাতটি প্রকৃতি-বিকৃতি এবং বিকারসমূহের উৎস। এটি এমন এক আদি কারণ যার কোনো কারণ নেই, তাই এটিই আদি প্রকৃতি এবং কোনো উৎপন্ন বস্তু নয়। এটি অন্য কিছু থেকে উৎপন্ন হয় না এবং সেই কারণে আদি প্রকৃতি অন্য কোনো কিছুরই উৎপন্ন বস্তু নয়। মহৎ প্রভৃতি সাতটি হলো উৎপন্ন বস্তু এবং উৎপাদক। মহৎ হলো বুদ্ধি। বুদ্ধি এবং বাকি সাতটি হলো— বুদ্ধি, অহংকার এবং পাঁচটি তন্মাত্র— এই সাতটি হলো প্রকৃতি-বিকৃতি (অর্থাৎ তারা একইসাথে অন্য কিছু থেকে উৎপন্ন এবং অন্য কিছুর উৎপাদক)।: কারণ, প্রধান (মূলপ্রকৃতি) থেকে বুদ্ধি উৎপন্ন হয় বলে এটি প্রধানের কার্য বা ‘বিকৃতি’ (উৎপন্ন), প্রকৃতির একটি বিকার, কিন্তু এটি নিজেই অহংকার উৎপন্ন করে এবং তাই এটি উৎপাদক।


অহঙ্কারোঽপি বুদ্ধেরুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, স চ পঞ্চ তন্মাত্রাণ্যুৎপাদয়তীতি প্রকৃতিঃ । তত্র শব্দতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, তস্মাদাকাশমুৎপদ্যত ইতি প্রকৃতিঃ। তথা স্পর্শতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, তদেবং বায়ুমুৎপাদয়তীতি প্রকৃতিঃ। গন্ধতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, তদেবং পৃথিবীমুৎপাদয়তীতি প্রকৃতিঃ। রূপতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, তদেবং তেজ উৎপাদয়তীতি প্রকৃতিঃ। রসতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত ইতি বিকৃতিঃ, তদেবং অপঃ উৎপাদয়তীতি প্রকৃতিঃ। এবং মহদাদ্যাঃ সপ্ত প্রকৃতয়ো বিকৃতয়শ্চ ॥

শব্দার্থ

অহঙ্কারোঽপি, অহঙ্কারও। বুদ্ধেরুৎপদ্যত, বুদ্ধি থেকে উৎপন্ন হয়। , সেটি (অহঙ্কার)। , এবং। তন্মাত্রাণ্যুৎপাদয়তীতি, তন্মাত্রসমূহকে উৎপন্ন করে এই কারণে। প্রকৃতিঃ, প্রকৃতি, কারণ। তত্র, সেখানে, সেই বিষয়ে, তার মধ্যে। শব্দতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত, শব্দতন্মাত্র, অহঙ্কার থেকে, উৎপন্ন হয়। ইতি, এই কারণে, এইভাবে। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। তস্মাদাকাশমুৎপদ্যত, তাহা (শব্দতন্মাত্র) থেকে, আকাশ, উৎপন্ন হয়। ইতি, এই কারণে। প্রকৃতিঃ, কারণ, উৎপাদক। তথা, সেইরূপ, একইভাবে। স্পর্শতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত, স্পর্শতন্মাত্র, অহঙ্কার থেকে, উৎপন্ন হয়। ইতি, এইভাবে। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। তদেবং, সেটি এইভাবে, সেই প্রকার। বায়ুমুৎপাদয়তীতি, বায়ুকে, উৎপন্ন করে, এই কারণে। প্রকৃতিঃ, কারণ, উৎপাদিকা শক্তি। গন্ধতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত, গন্ধতন্মাত্র, অহঙ্কার থেকে, উৎপন্ন হয়। ইতি, এই কারণে। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। তদেবং, সেটি একইভাবে। পৃথিবীমুৎপাদয়তীতি, পৃথিবীকে, উৎপন্ন করে, এই কারণে। প্রকৃতিঃ, কারণ। রূপতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত, রূপতন্মাত্র, অহঙ্কার থেকে, উৎপন্ন হয়। ইতি, এইভাবে। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। তদেবং, সেটি এইভাবে। তেজ, তেজ, অগ্নি, আলো। উৎপাদয়তীতি, উৎপন্ন করে, এই কারণে। প্রকৃতিঃ, কারণ। রসতন্মাত্রমহঙ্কারাদুৎপদ্যত, রসতন্মাত্র, অহঙ্কার থেকে, উৎপন্ন হয়। ইতি, এইভাবে। বিকৃতিঃ, বিকার, কার্য। তদেবং, সেটি একইভাবে। অপঃ, জল, বারি। উৎপাদয়তীতি, উৎপন্ন করে, এই কারণে। প্রকৃতিঃ, কারণ। এবং, এইভাবে, এই প্রকারে। মহদাদ্যাঃ, মহৎ (বুদ্ধি) প্রভৃতি, মহৎ-অহঙ্কার-পঞ্চতন্মাত্র। সপ্ত, সাত, সাতটি তত্ত্ব। প্রকৃতয়ো, প্রকৃতিসমূহ, কারণসমূহ। বিকৃতয়শ্চ, এবং বিকারসমূহ, এবং কার্যসমূহ।

অহংকারও বুদ্ধি থেকে উৎপন্ন হয় এবং তাই এটি একটি উৎপন্ন বস্তু; কিন্তু এটি উৎপাদক বস্তুও, কারণ এটি পাঁচটি তন্মাত্র কে জন্ম দেয়। শব্দ-তন্মাত্র অহঙ্কার থেকে উৎপন্ন হয় বলে বিকৃতি এবং তা থেকে আকাশ উৎপন্ন হয় বলে প্রকৃতি; একইভাবে স্পর্শ-তন্মাত্র অহঙ্কার থেকে উৎপন্ন হয় বলে বিকৃতি এবং তা বায়ু উৎপন্ন করে বলে প্রকৃতি; গন্ধ-তন্মাত্র অহঙ্কার থেকে উৎপন্ন হয় বলে বিকৃতি এবং তা পৃথিবী উৎপন্ন করে বলে প্রকৃতি; রূপ-তন্মাত্র অহঙ্কার থেকে উৎপন্ন হয় বলে বিকৃতি এবং তা তেজ উৎপন্ন করে বলে প্রকৃতি; রস-তন্মাত্র অহঙ্কার থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে বিকৃতি এবং তা জল উৎপন্ন করে বলে প্রকৃতি এবং এই প্রকারে মহৎ (বুদ্ধি) প্রভৃতি সাতটি তত্ত্ব প্রকৃতি ও বিকৃতি উভয়ই।


ষোড়শকশ্চ বিকার: পঞ্চবুদ্ধীন্দ্রিয়াণি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়াণি একাদশং মন: পঞ্চমহাভূতা নি এষ ষোড়শকো গণো বিকৃতিরেব । বিকারো বিকৃতি: ॥ ন প্রকৃতির্ন বিকৃ তি: পুরুষ: ॥ এবমেষাং ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞানাং ত্রয়াণাং পদার্থানাং কৈ: কিয়দ্ভি: প্রমাণৈ: কেন কস্য বা প্রমাণেন সিদ্ধির্ভবতি । ইহ লোকে প্রমেয় বস্তু প্রমা ণেন সাধ্যতে যথা প্রস্থাদিভির্ব্রীহয়স্তুলয়া চন্দনাদি । তস্মাৎ প্রমাণ মভিধেয়ং ।

শব্দার্থ

ষোড়শকশ্চ, ষোলোটি উপাদানের সমাহার, এবং। বিকারঃ, বিকার, কার্য, যা থেকে অন্য কিছু উৎপন্ন হয় না। পঞ্চবুদ্ধীন্দ্রিয়াণি, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক)। পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়াণি, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু ও উপস্থ)। একাদশং, একাদশতম। মনঃ, মন। পঞ্চমহাভূতানি, পাঁচটি মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম)। এষ, এই। ষোড়শকো, ষোলোটি সংখ্যার। গণো, সমূহ, গোষ্ঠী। বিকৃতিরেব, কেবল বিকারই, কেবল কার্যই। বিকারো, বিকার। বিকৃতিঃ, বিকৃতি, কার্য। , নয়, না। প্রকৃতির্ন, প্রকৃতি নয়। বিকৃতিঃ, বিকৃতি, কার্য। পুরুষঃ, পুরুষ, আত্মা, শুদ্ধ চৈতন্য। এবমেষাং, এইভাবে এদের। ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞানাং, ব্যক্ত (দৃশ্য জগত), অব্যক্ত (মূল প্রকৃতি) এবং জ্ঞ (পুরুষ বা আত্মা)। ত্রয়াণাং, তিনটির, তিন প্রকারের। পদার্থানাং, পদার্থসমূহের, তত্ত্বসমূহের। কৈঃ, কোন্ কোন্ প্রমাণ দ্বারা। কিয়দ্ভিঃ, কত সংখ্যক। প্রমাণৈঃ, প্রমাণসমূহের দ্বারা। কেন, কিসের দ্বারা। কস্য, কার। বা, অথবা। প্রমাণেন, প্রমাণের দ্বারা। সিদ্ধির্ভবতি, সিদ্ধি বা প্রমাণ হয়। ইহ, এই। লোকে, জগতে। প্রমেয়, প্রমেয়, যা প্রমাণের বিষয়। বস্তু, বস্তু, পদার্থ। প্রমাণেন, প্রমাণের সাহায্যে। সাধ্যতে, সাধিত বা প্রমাণিত হয়। যথা, যেমন। প্রস্থাদিভির্ব্রীহয়স্তুলয়া, প্রস্থ (পরিমাপক পাত্র) প্রভৃতি দিয়ে ধানসমূহকে এবং দাঁড়িপাল্লা দিয়ে। চন্দনাদি, চন্দন প্রভৃতি। তস্মাৎ, সেই হেতু, অতএব। প্রমাণমভিধেয়ং, প্রমাণ আলোচনা করা উচিত বা প্রমাণের লক্ষণ বলা প্রয়োজন।

ষোড়শ প্রকার বিকার হচ্ছে— পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, একাদশতম মন এবং পাঁচটি মহাভূত; এই ষোড়শ তত্ত্বের সমাহার কেবল বিকৃতি। বিকার শব্দের অর্থ বিকৃতি। পুরুষ না প্রকৃতি, না বিকৃতি। এখন ব্যক্ত, অব্যক্ত এবং জ্ঞ—এই তিন প্রকার পদার্থের সিদ্ধি কোন এবং কতগুলি প্রমাণের দ্বারা হয়, তা বলতে হবে। এই জগতে প্রমেয় বস্তু প্রমাণের মাধ্যমেই সিদ্ধ হয়, যেমন প্রস্থ প্রভৃতি পাত্রের দ্বারা ধান এবং তুলাদণ্ডের দ্বারা চন্দন প্রভৃতি পরিমাপ করা হয়। অতএব, প্রমাণের স্বরূপ বর্ণনা করা প্রয়োজন।

মূলপ্রকৃতি
মহৎ (বুদ্ধি), অহংকার, ৫টি তন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)
১৬৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, মন, ৫টি মহাভূত
পুরুষ (আত্মা)


যুক্তিদীপিকা